মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না প্রবৃদ্ধি!
- Update Time : ১১:৫০:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫
- / ২০৫ Time View

ডেস্ক রিপোর্টঃ
উভয় সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর তাগাদা। ৩১ জুলাই এই অর্থবছরের (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে মূল্যস্ফীতি না প্রবৃদ্ধি- অর্থনীতির কোন দিককে অগ্রাধিতার দেওয়া হবে, সে দিকে নজর রয়েছে অর্থনীতিবিদদের। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকার এবারও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এবারের মুদ্রানীতিতেও আগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে। অর্থাৎ সংকোচনমুখী প্রবণতা। এখনো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতি কমলেও এখনো তা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছায়নি।মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গত এক বছরে তিন দফায় নীতি সুদহার বাড়িয়ে বাজারে টাকার প্রবাহ কমানোর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে একই সময়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত তারল্যসংকট দেখা দেয়। এই অবস্থায় গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর পূর্বঘোষিত অবস্থান থেকে সরে গিয়ে টাকা ছাপিয়ে এসব ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দিয়েছেন। এতে বাজারে অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের ঘোষিত সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ অব্যাহতভাবে কমছে। সেই সঙ্গে বিনিয়োগও তলানিতে নামছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে। এ অবস্থায় সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির বিকল্প নেই। তবে কেবল সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির মাধ্যমেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এর সঙ্গে রাজস্ব নীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনাও সঠিকভাবে কার্যকর করতে হবে। তা না হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যায়, প্রবৃদ্ধিও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকলে সুদের হার কমালেও বিনিয়োগ বাড়বে না।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এবার যে মুদ্রানীতি দিচ্ছে, সেটা আগের ছয় মাসের ধারাবাহিকতায় অপরিবর্তিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে কার্যকর আর কোনো হাতিয়ার নেই।’ তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনো উচ্চপর্যায়েই রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যদি এখন শিথিল নীতি গ্রহণ করা হয়, তাহলে বাজারে ভুল সংকেত যাবে। মানুষ ভাববে, মূল্যস্ফীতি আর গুরুত্ব পাচ্ছে না। তখন বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়বে, পণ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। তবে শুধু নীতি সুদহার বাড়ালেই হবে না, মুদ্রানীতি কার্যকর করতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনায়ও নজর দিতে হবে। চালসহ অনেক পণ্যের দাম বাড়ছে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে। সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যা আছে, প্রশাসনিক নজরদারির অভাব আছে। সেগুলোর বিষয়েও সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
জ্যেষ্ঠ এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। ফলে ব্যবসা-বিনিয়োগ কমছে, কর্মসংস্থান কমছে, মানুষের আয়ও কমছে। মজুরি বাড়ছে না, কিন্তু খরচ বাড়ছে। ফলে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে শুধু মুদ্রানীতিকে না, বরং অন্য নীতিকে এর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ চেইন, আমদানি-রপ্তানি- এসব জায়গায় সমন্বয় না হলে সংকোচন নীতির সুফল পাওয়া যাবে না।’তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাইছি মূল্যস্ফীতি কমুক, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে যদি অর্থনীতি একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সেটাও তো সমাধান নয়। তাই মুদ্রানীতিকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি কমে, আবার প্রবৃদ্ধিও থেমে না যায়।’
একই বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির কথা বললেও কিছু ক্ষেত্রে সম্প্রসারণমূলক আচরণ করছে। যেমন, বাজার থেকে ডলার কিনছে। আবার দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টাকা ছাপিয়ে অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। এতে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এসব কারণেই মূল্যস্ফীতি খুব বেশি কমছে না। তা ছাড়া দেশে এখনো বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। এই অবস্থায় ঋণের সুদহার কমলেও বিনিয়োগ বাড়বে না। আবার দীর্ঘদিন বিনিয়োগে খরা থাকলে পুরো অর্থনীতি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।’বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেই জোর দিতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য বিনিময় হারের ওপর চাপ কমিয়ে রিজার্ভ ধরে রাখতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপে সরকারও সমর্থন দিচ্ছে। এ কারণে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নীত পদক্ষেপের কারণে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় আসেনি, তাই এবারও সংকোচনমূলক নীতিতেই থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন মুদ্রানীতিতে শুধু নীতি সুদহার নয়, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সুদের হারও অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। এতে নীতি সুদহার করিডরের স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা থাকছে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশেই। মুদ্রানীতি ঘোষণার আগেই স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) নিচের সীমা সামান্য কমিয়ে ৮ দশমিক ৫০ থেকে ৮ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওভারনাইট রেপো সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। ফলে ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে স্বল্পমেয়াদি আমানত রাখার সুদ কিছুটা কমবে; কিন্তু ধার নেওয়ার খরচ অপরিবর্তিতই থাকবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, জুনে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে। এটি বিগত ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে মে মাসে ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। অর্থাৎ জুনে মূল











